Thursday, January 28, 2021
Home > জাতীয় সংবাদ > বছরের আলোচিত নাম ” করোনা “

বছরের আলোচিত নাম ” করোনা “

এপিপি বাংলা : বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের দাপট এখনও চলছে। চীনের উহান শহর থেকে এই ভাইরাসটি এক এক করে বিশ্বের সবক’টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি বছর বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এই অদৃশ্য ভাইরাসটি। জনজীবনের স্বাভাবিকতা কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে করোনা। প্রতিরোধী টিকা আবিস্কারের সুখবর আসার মধ্যেই করোনার নতুন ধরন আবারও বিশ্ববাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। তীব্র করোনা পরিস্থিতির মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটসহ নানা অব্যবস্থাপনার চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। দুর্নীতিতে জড়িত বেশকিছু কর্মকর্তাকে ওএসডি-বদলি করা হয়েছে। আবার অভিযুক্ত অনেকে এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন। তবে স্বাস্থ্য খাতেও অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। করোনার শুরুতে অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় শুরু হয়েছিল সরকারের নানা উদ্যোগে তা কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। অনেক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার মাইনাসে নেমে গেলেও বাংলাদেশ আশার আলো দেখাচ্ছে।
করোনায় শিক্ষা খাতে বিপর্যয় এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। সব মিলিয়ে করোনাভাইরাসের কারণে বহুল আলোচিত একটি বছর পার হলো। আরও কতদিন এই ভাইরাসের আতঙ্ক বয়ে বেড়াতে হবে, তা এখনও অজানা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে এ-সংক্রান্ত সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত ভাইরাসের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো করোনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশও লড়াই করে চলছে।
স্বাস্থ্যে একের পর এক কেলেঙ্কারি, ব্যাপক রদবদল :দেশে করোনা সংক্রমণের পরপর মার্চের শেষ দিকে হাসপাতালে এন-৯৫ মাস্কের মোড়কে ভুয়া মাস্ক সরবরাহের মধ্য দিয়ে করোনায় কেনাকাটার দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এন-৯৫ মাস্কের মোড়কে ভুয়া মাস্ক সরবরাহ করে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার। ভুয়া এসব মাস্কের বিষয়টি নজরে আসার পর মুগদার পরিচালককে ওএসডি করা হয়। বর্তমানে তিনি অবসরে আছেন। আর খুলনার পরিচালককে প্রথমে বরিশাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এবং পরে পাবনা মানসিক হাসপাতালে বদলি করা হয়।

ভুয়া ওই মাস্কের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপ। দুদকের মামলায় জেএমআই চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপর একে একে সিএমএসডিকেন্দ্রিক আটশ কোটি টাকার কেনাকাটার দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই দুর্নীতির বিষয় নিয়ে সংশ্নিষ্টদের হুঁশিয়ার করেন।
করোনা-সংক্রান্ত কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে সিএমএসডি পরিচালক ব্রিগেডিয়ার মো. শহীদুল্লাহকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর গত ৩০ মে জনপ্রশাসন সচিবের কাছে লিখিত এক চিঠিতে তিনি দুর্নীতির পুরো চিত্র ফাঁস করে দেন। ব্রিগেডিয়ার শহীদুল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠন করা টাস্কফোর্স কমিটির সুপারিশের আলোকে সিএমএসডি পিপিই, মাস্কসহ সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয় করে বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করে। সুতরাং নিম্নমানের সুরক্ষাসামগ্রী কেনার দায় তার বা সিএমএসডির নয়।
ওই টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন অধ্যাপক ডা. সামিউল ইসলাম। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিবি ল্যাপ্রোসি ও এসটিডি এইডস কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর। সাড়ে আটশ কোটি টাকার কেনাকাটা তার নেতৃত্বেই হয়েছে। একইসঙ্গে ১৪২ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগেও তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সমকালসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ-সংক্রান্ত একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অথচ ওই কর্মকর্তা এখনও বহাল আছেন।
দুর্নীতির অভিযোগ উঠে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির অর্থায়নে করোনা-সংক্রান্ত সামগ্রী কেনা নিয়েও। ওই কর্মসূচির দায়িত্বে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীর। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার তার তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ওএসডি করা হয়। সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ব্যর্থতার দায়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলামকেও অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত, যুগ্ম ও উপসচিব মিলে আরও অন্তত ১০ জনকে বদলি করা হয়।
রিজেন্ট হাসপাতালে করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার ঘটনায় আলোচিত সাহেদকাণ্ডে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক ডা. আমিনুল হাসানকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত ছিল স্বাস্থ্য খাত।
চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মৃত্যুর বছর :করোনায় গত ৯ মাসে রেকর্ডসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এক বছরে এর আগে এত সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর আর মৃত্যু হয়নি। করোনা মহামারির শুরুতে পিপিই, মাস্কসহ সুরক্ষাসামগ্রী নিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। নিম্নমানের পিপিই, মাস্ক ও সুরক্ষাসামগ্রীর কারণে অনেকে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিতেও অনীহা প্রকাশ করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব অভিমান ভুলে আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিত হন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
করোনায় এই সম্মুখসারির যোদ্ধাদের প্রায় দেড়শ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মৃতদের মধ্যে আছেন ১২৩ চিকিৎসক ও ১৮ নার্স। আক্রান্ত হয়েছেন আট সহস্রাধিক। এর মধ্যে আছেন ২ হাজার ৮৮৭ জন চিকিৎসক, ১ হাজার ৯৭৯ জন নার্স এবং ৩ হাজার ২৮৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী।
আলোচনায় আরিফ-সাবরিনা দম্পতি ও সাহেদকাণ্ড :করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে দেশজুড়ে যখন আতঙ্ক, প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে, ঠিক তখনই একে একে বেরিয়ে আসে করোনার নমুনা পরীক্ষা নিয়ে ভয়াবহ দুর্নীতির কাণ্ড। জেকেজি হেলথ কেয়ারের কর্ণধার আরিফুল ইসলাম ও ডা. সাবরিনা চৌধুরী দম্পতি এবং রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ নামে তিন ব্যক্তি করোনার নমুনা পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট প্রদান করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।
এ ঘটনার ২৩ জুন জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই অভিযোগে ১২ জুলাই গ্রেপ্তার করা আরিফুলের স্ত্রী জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক ইউনিটের সহকারী সার্জন ডা. সাবরিনাকেও। রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এরপরই বেরিয়ে আসে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদকাণ্ড।
ভুয়া রিপোর্ট প্রদানের পাশাপাশি লাইসেন্স ছাড়াই হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন এই মহাপ্রতারক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এ তথ্য বেরিয়ে আসে। এরপর গা-ঢাকা দেন সাহেদ। ১৫ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। রিমান্ড শেষে গত ২৩ আগস্ট তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনা ইউনিটে নকল ‘এন-৯৫’ মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগ নেত্রী শারমিন জাহানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রিমান্ড শেষে ২৮ জুলাই তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়।
বেকারত্ব ও সামাজিক প্রভাব :করোনা মহামারিতে দেশে দেশে দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে। কর্মসংস্থান হারিয়ে কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবার ও সমাজে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বেকার হয়ে পড়ায় সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। আর্থিক অনটনের কারণে রাজধানী থেকে হাজার হাজার মানুষ গ্রামে ফিরে গেছেন। বিশ্বব্যাংকের ‘পোভার্টি অ্যান্ড শেয়ারড প্রসপারিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনায় বিশ্বে অতিদারিদ্র্যের হার ৮-৯ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বে আরও ১১ থেকে ১৫ কোটি মানুষ গরিব হয়ে যেতে পারে।
চলতি বছরের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাকালে বাংলাদেশে গরিব লোকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। দারিদ্র্যের হার সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) বলেছে, গত এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৯ থেকে বেড়ে ২৯ শতাংশ হয়েছে। প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে। এছাড়া আগে থেকেই সাড়ে তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত।
করোনায় দারিদ্র্য হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে সিপিডির অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এছাড়া গত জুন মাসে পিপিআরসি ও বিআইজিডির যৌথ গবেষণায় বলা হয়, দারিদ্র্যের হার ৪৩ শতাংশে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিনের সরকারি ছুটি বাতিল করার পর জুলাই থেকে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়। পিপিআরসি ও বিআইজিডি যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনার প্রথম দিকে এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ছুটি ও লকডাউনের প্রভাবে গত এপ্রিল মাসে গরিব মানুষের আয় ৭৫ শতাংশ কমেছে। আর গরিব হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের আয় কমেছে ৬৫ শতাংশ।
অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি :করোনা মহামারির কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দেশে দেশে এই সংকট তীব্র হচ্ছে। ধনী-গরিব সব দেশের অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব পড়েছে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ধুঁকছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন কোটি কোটি মানুষ।
১৯৩০ সালের মহামন্দায় বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো বিপাকে পড়েছিল। প্রায় দশকজুড়ে চলে সেই মহামন্দা। নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি দুর্যোগের কবলে পড়ে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে যে সর্বজনীন মন্দা তৈরি হয়েছে তা আগে কখনও দেখা যায়নি। বিশ্বের সব দেশের অর্থনীতিতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বেশিরভাগ দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) সংকোচন হবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে এর মধ্যেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানির মতো ধনী রাষ্ট্রগুলো এমনকি প্রতিবেশী ভারতের জিডিপি সংকুচিত হবে। জিপিডি সংকুচিত হলেও বাংলাদেশ বেশ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাব বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি বছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে এত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না বলে মনে করছে দাতা সংস্থাগুলো।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কতটা গভীর হয়, মূলত তার ওপর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বিষয়টি নির্ভর করছে। প্রবৃদ্ধিতে চতুর্থ শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে বাংলাদেশ সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। এই হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর মিসরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৫, চীনে ১ দশমিক ৯ এবং ভিয়েতনামে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ ৫৩ দেশের মধ্যে অন্য সব দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার মাইনাসে রয়েছে।
করোনা পরিস্থিতির শুরুতেই অর্থনৈতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে ওই প্রণোদনা প্যাকেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে অর্থনীতি এখন অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তবু ধুঁকছে শিল্প খাত :করোনা সংক্রমণের পর গত এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশের উৎপাদন খাত সবচেয়ে খারাপ সময় পার করে। ওষুধ, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী, সাবানসহ হাতেগোনা কয়েকটি পণ্যের উৎপাদন বাড়লেও অন্য সব শিল্পের উৎপাদনে ব্যাপক ধস নামে। সিংহভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল কিংবা উৎপাদন কমিয়ে এনেছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি ও প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাক খাত চরম ক্রান্তিকাল পার করে। করোনা মহামারির মধ্যে গত এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত তিন মাসে তৈরি পোশাকের উৎপাদন অর্ধেকের বেশি হ্রাস পায়। বিবিএস বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে ৩২ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকার পোশাক উৎপাদন হয়েছে। ২০১৯ সালের একই সময়ে ৬৯ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকার পোশাক উৎপাদন হয়েছিল।
‘অটো প্রমোশনের’ শিক্ষা খাত :দেশে গত ৮ মার্চ করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার ৯ দিনের মাথায় ১৭ মার্চ থেকে ছুটি ঘোষণা করা হয়। দফায় দফায় সেই ছুটি বাড়ানো হয়। এরপর অফিস-আদালত খুললেও আজ পর্যন্ত সচল হয়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে এবারই প্রথমবারের মতো ‘অটো প্রমোশন’ পেয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ইউনেস্কো বলছে, করোনার কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইসঙ্গে ঝরে পড়তে পারে ২ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী।
দেশে প্রাইমারি স্কুলে প্রায় এক কোটি, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে প্রায় ৪ লাখ, মাধ্যমিক স্কুলে প্রায় এক কোটি, উচ্চমাধ্যমিক স্কুল ও কলেজে ৪০ লাখ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় প্রায় ২৮ লাখ এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩৮ লাখ এবং মাদ্রাসায় প্রায় ৩৫ লাখের মতো শিক্ষার্থী রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে এখনও পরীক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। অনলাইনে ক্লাস হলেও তা শিক্ষার্থীদের খুব একটা কাজে আসছে না। অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান টিউশন ফির জন্য চাপ অব্যাহত রাখায় দরিদ্র পরিবারের পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সম্প্রতি জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিও শিক্ষা খাতে ঝুঁকির কথা স্বীকার করেছেন। সব মিলিয়ে শিক্ষা খাত বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

Like & Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *