Wednesday, August 4, 2021
Home > জাতীয় সংবাদ > লিখতে চাই : তোফায়েল গাজালি

লিখতে চাই : তোফায়েল গাজালি

নবীন লেখকরা লেখালেখির বিষয়বস্তুর খরায় ভোগেন প্রচণ্ডভাবে। ‘কী লিখবেন? কেন লিখবেন?’ এই টাইপের একটি বইও হয় তো কিনে ফেলেন শ’দেড়শ টাকা দিয়ে। দু-একটি সাহিত্য আসরেও যোগদেন। পকেটের টাকা খরচ করে লেখালেখির কোর্সেও ভর্তি হন কেউ কেউ। বিষয়স্তু না পেয়ে কেউ কেউ বিদেশী বইয়ের অনুবাদে মনোনিবেশ করেন এক মনে। (অনুবাদ নিয়ে বিস্তর কথা আছে বলব অন্য দিন)।
গণমাধ্যমে কাজের সুবাদে প্রতিদিন এরকম প্রচুর ফোন, ই-মেইল ও মেসেজ পাই যে, ‘ভাইয়া! কী বিষয়ে লিখব?’
‘লেখালেখির বিষয় বস্তু যেটাকে এ সময়ে কন্টেন্ট নামে আমরা চিনি। ফেইসবুক, ইউটিউব নিউজ পোর্টাল বা অন্য কোথাও কন্টেন্ট ক্রিয়েটের উপর যেমন পোস্টের ভিউ নির্ভর করে তেমনি পাঠকের কাছে লেখা গ্রহণযোগ্য হওয়া নির্ভর করে বিষয়বস্তু নির্বাচনের উপর। বোঝার সুবিধার্তে কথাটিকে সহজে এভাবে বলতে চাই, বিষয়বস্তু নির্বাচনের যোগ্যতা ছাড়া লেখক হওয়া যায় না।

বিষয়বস্তু নির্বাচন করব কীভাবে?
আপাতত শুধুই ধর্মীয় লেখালেখির কথা যাদি ধরি তাহলে প্রথমে নির্বাচন করতে হবে, আমি ধর্মীয় বিষয়ে কী করতে চাই? ফিচার! প্রতিবেদন! সংবাদ! প্রবন্ধ-নিবন্ধ! কী লিখতে চাই?
ধর্মীয় লেখকদের সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গা যেটা সেটা হচ্ছে- তাদের চিন্তার পরিধি খুবই ছোট ও সংকীর্ণ। ওজু, নামাজ, রোজা, হজ, কুরবানির বাহিরে যে, ধর্মীয় লেখা হতে পারে ৯০ ভাগ ধর্মীয় লেখকদের মাথায় এ কথাটি আসেই না। কেউ কেউ তো পারলে লেখায় পুরো বুখারী শরীফই কপি করে দিয়ে দেন। কেউ পুরো হেদায়াও দিয়ে দিতে চান।
আমার লেখালেখির গুরু, দৈনিক যুগান্তরের সাবেক বিভাগীয় সম্পাদক হাফেজ আহমাদুল্লাহ (রহ.) বলতেন, ‘যদি শুধুই হাদিস পড়তে হবে বা শুধুই আয়াত পড়তে হবে তাহলে মানুষকে তোমার লেখা পড়তে হবে কেন? সোলেমানিয়া বুক হাউস থেকে একটি বুখারী শরীফ বা বাংলা কুরআন শরীফ কিনে নিলেই হয়।’
ধরেন আপনি নামাজ নিয়ে লিখতে বসলেন, নামাজের হাদিসের তো অভাব নেই। আপনি যদি নামাজের ফজিলত সংক্রান্ত চারজনের বর্ণিত একই রকমের চারটি হাদিসকে এক হাজার শব্দের একটি লেখায় চার বার উল্লেখ করেন তাহলে লেখাটির চেহারা কেমন হবে, রুচিশীল পাঠক মাত্রই তা বুঝতে পারছেন। রেফারেন্স হিসাবে হাদিস, আয়াত ইত্যাদি আপনার লেখাকে শক্তিশালী করবে ঠিকই কিন্তু লেখায় লেখকের নিজস্ব বক্তব্য, গবেষণার ফলাফল, চিন্তার খোরাক ও সৃজনশীলতার ছাপ না থাকলে পাঠক সে লেখা গ্রহণ করতে চান না।
ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে যুগ যুগ থেকে লেখা লেখি হচ্ছে, হবে এবং হতেই হবে। তবে আজকের ব্যস্ত পৃথিবীর পাঠকরা কোন ভারী লেখাই এখন আর গ্রহণ করছেন না- চাই সেটা ধর্মীয় হোক আর ধর্মহীন হোক। তাই লক্ষ করলে দেখবেন, মোটামোটি সব পত্রিকার সম্পদকীয় পাতাগুলোর পরিসর এখন একেবারে সীমিত হয়ে আসছে। জাতীয় দৈনিকগুলোর ফিচার পাতায় একসময় হাফ পেইজর লিড হতো এখন এর পরিসরও খুবই ছোট হয়ে যাচ্ছে। কারণ এত বড় বড় লেখা পড়ার সময় মানুষের হাতে এখন আর নেই। এই সময়ের লেখার বিষয়বস্তুতে থাকতে হবে নতুনত্ব। লেখা হতে হবে সংক্ষিপ্ত, আকর্ষণীয় এবং সময় উপযোগী।
আপনি যদি ডিসেম্বর মাসে মাতৃভাষার গুরুত্ব নিয়ে লিখা পাঠান সে লেখা সম্পাদক ছাপাবেন না। করোনার সময় কলেরার লেখা দেন সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না।
একজন লেখককে সব সময় চোখ কান খোলা রাখতে হবে। দেশে কী ঘটছে? বিশ্বে কী হচ্ছে? মানুষের সমস্যা কী? ইসলাম ও দেশের সম্ভাবনা কিসে? সংকটে করণীয় কী? মোকাবেলার উপায় কী? ইত্যাদির আলোক ফিচার হতে পারে। প্রবন্ধ হতে পারে। কবিতা লিখতে পারেন।
আপনি যদি লেখালেখির একেবারে শুরুতে থাকেন তাহলে এতসব জামেলায় যাওয়ার দরকারই নেই। চোখের সামনে যা পাবেন তা নিয়েই লেখা শুরু করুন। ধরেন, আজ জুমার নামাজ পড়েছেন বায়তুল মুকাররম মসজিদে। মসজিদের কোন জিনিসটি আপনার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে। কোন জিনিসগুলো খারাপ লেগেছ। মুসল্লিদের উপস্থিতি ও আগ্রহ কেমন দেখলেন। প্রয়োজনে নামাজের পর দুজন মুসল্লির সঙ্গে টুকটাক কথাও বলেনিন মসজিদ বিষয়ে। যাতে তাদের কথাগুলো আপনার লেখায় যুক্ত করতে পারেন। মসজিদ ব্যবস্থাপনার ইসলামি পদ্ধতির সঙ্গে বায়তুল মোকাররমরে কতোটা মিল পেলেন। ইসলামের মসজিদ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লেখে ফেলেন আস্ত একটা ফিচার। আরেকটু অপেক্ষা করে প্রয়োজনে ইমাম বা খতিব সাহেবের ছোট্ট একটি বক্তব্য নিয়ে নিন। লেখার শেষ দিকে মসজিদের ইতিহাস ঐতিহ্য লিখে সুন্দর একটি উপসংহার টানুন। এবার লেখক হতে আপনাকে, কে ঠেকায়!!!

সহ-সম্পাদক,

দৈনিক যুগান্তর

Like & Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *