Tuesday, November 30, 2021
Home > জাতীয় সংবাদ > কী পড়ব ?

কী পড়ব ?

আমাদের প্রেরণার উৎস মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহ. বলতেন, ‘পড় একশত পাতা আর লেখ এক পাতা।’ তিনি আফসোস করতেন আর হাত দিয়ে হাটু চাপড়াতে চাপড়াতে বলতেন, ‘মিয়া! আপনারা তো পড়ালেখা ছাড়াই লেখক হয়ে যেতে চান।’ নিদারুন কষ্টের কথা হলো- আজকাল লেখকরা অধ্যায়ন- অধ্যবসায় ছেড়ে দিয়েছেন।যা পড়েন তা হলো ফেইসবুক।যা লেখেন তা হলো স্ট্যাটাস। গত পাঁচবছরে ফেইসবুক থেকে কেউ লেখক হিসেবে গড়ে উঠেছেন আমার জানা নেই। থাকলেও এরকম কেইস রেয়ার বলে আমি মনে করি। এর মূল কারণ হলো, এখানে লিখতে পুঁজি লাগে না। পুঁজি মানে জ্ঞানের পুঁজি, দক্ষতার পুঁজি, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার পুঁজি। অবশ্য কারো সমালোচনা করা বা কাউকে তাচ্ছিল্য করার বিকল্পহীন প্লাটফর্ম ফেইসবুক। অনেক ফেইসবুকারকে আক্ষেপ করতে শুনেছি যে, এখানে গবেষণা করে বা লেখাপড়ে করে কিছু পোস্ট করলে কেউ পড়ে বলে মনে হয় না। এটা আমারও উপলব্ধি। তবে সঙ্গে সঙ্গে আমি আরেকটি জিনিস মনে করি তাহলো, আমার একটি ভালো লেখার দ্বারা যদি একজন পাঠকেরও ন্যুনতম উপকার হয় তবেই আমার লেখাটি স্বার্থক। এখানে লাইক কমেন্ট বিবেচনা করা অনুচিত।
পড়ব কী?
আমি আসলে এই লেখাগুলো আমার নিজস্ব ঘরের মানে ইসলামি ঘরানার নবীন লেখকদের উদ্দেশে লিখছি। তাই আমার কথাগুলো সামগ্রীক বিবেচানায় না নেওয়াই যুক্তিযুক্ত হবে।
দৈনিক যুগান্তরের সাবেক বিভাগীয় সম্পাদক হাফেজ আহমাদ উল্লাহ ভাই আমাকে বলতেন, ‘তুই যদি মনে করিস, যে গল্পে আকাশ কান্দে, বাতাস হাসে’ ইসলামি টাওয়ারের এসব বই পড়ে অথবা শুধুই শরৎ, বঙ্কিম কিংবা রবি ঠাকুর পড়ে লেখক হতে- তাহলে জীবনে কোনদিন লেখক হতে পারবি না। তোকে দুটি কাজ করতে হবে-
১. প্রথমত এই সময় বাংলাভাষার নেতৃত্ব কার হাতে বা কাদের হাতে তাদেরকে খোঁজে বের করতে হবে এবং এক মনে তাদেরকে গিলে খেতে হবে। হ্যাঁ! লেখক তার কলমকে শানিত করার জন্য এবং চিন্তার পরিসরকে বিস্তৃত করতে ক্রমান্বয়ে শুধু দেশী সাহিত্যই নয় বরং বিশ্ব সাহিত্যও পড়বেন। বিশ্ব সাহিত্যের কী পড়বেন সেটা তাকে সময় বলে দেবে।
আহমাদ উল্লাহ ভাই যখন ২০০৯ এর দিকে আমাকে এ কথাগুলো বলছিলেন তখন হুমায়ূন স্যার বেঁচে ছিলেন।তার কথা শুনে হুমায়ূন পাঠে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ডুবে ছিলাম।আমি এখনও সুযোগ মত হুমায়ূন স্যারকে পড়ি।বাংলা-ভাষা ও সাহিত্য শেখার জন্য হুমায়ুন স্যারের বিকল্প কাউকে আমি আজও আবিস্কার করতে পারিনি।এটা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত।
২. দ্বিতীয়তো সময়কে পড়তে হবে। সময়কে পড়ার যোগ্যতা যদি লেখকের না থাকে তিনি লেখক হতে পারবেন না।লেখককে সাধনা করে সময়ের পাঠগুলো শিখতে হয়।
এখানে প্রিয় Sharif Muhammad শরীফ মুহাম্মদ দাদার একটি বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গত ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ইং দৈনিক যুগান্তরকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে মাদ্রাসার ছাত্রদের দুটি দিক লক্ষ রাখতে হয়। প্রথমত সাহিত্যের দিক, দ্বিতীয়ত মতাদর্শিক দিক। বাংলাসাহিত্যের প্রধান যেসব সাহিত্যিক, তাদের নব্বই শতাংশের সঙ্গেই আমাদের মতাদর্শ মেলে না। ফলে ঢালাওভাবে তাদের লেখা পড়তে গেলে অনেকে বিচ্যুত হয়। তাই একটা নিরাপত্তাহীনতা সব সময় জড়সড়ো করে রাখে।
আর আলেমদের মাঝেও ভালো গদ্য লিখিয়ে আছেন এখন। মাদ্রাসায় যারা প্রাথমিক স্তরে ভাষাচর্চা করে, তারা প্রতিষ্ঠিত গদ্য লেখক আলেমদের গদ্যই পড়তে পারে। বরং এটাই নিরাপদ। প্রাথমিক স্তরের পর তার বয়স বাড়বে, জ্ঞান বাড়বে। তখন সে চাইলে, ভরসা পেলে, গদ্যটাকে আরও উন্নত করতে বাইরে হাত বাড়াতে পারে।’
দাদার এ বক্তব্যের সঙ্গে শুধু একটি কথাই যুক্ত করতে চাই তাহলো- পড়ার জন্য বই নির্বাচন করার আগে নবীন লেখকদের উচিত অবশ্যই বড়দের কাছ থেকে বইয়ের মান ও পড়ার উপযোগিতা সম্পর্কে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে নেওয়া। কারণ এরকম বহু বই বাজারে আছে, যে বই আপনার লেখক সত্ত্বাকে আরো দশ বছর পিছিয়ে দিতে পারে।
সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভীর একটি বক্তব্য উল্লেখ করে লেখার ইতি টানছি। তিনি বলেছেন, তোমার পড়ার টেবিল কোন পাবলিক লাইব্রেরির টেবিল নয় যে, যা পাবে তাই এখানে তুলে রাখবে।

লেখক : তোফায়েল গাজালি, সহ-সম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

Like & Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *